বাজেটে মাদ্রাসার প্রতি বৈষম্য রয়েই গেল
ফিরোজ আলম: করোনার কারণে বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষাকার্যক্রম চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাজেট ঘোষনার পরে ও মনে হচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্তই হবে।বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে মাদরাসা শিক্ষা তিন ভাবে বিভক্ত ।সরকারি আলিয়া, বেসরকারি আলিয়া এবং কওমি। দেশে সরকারি মাদরাসা রয়েছে তিনটি ঢাকা আলিয়া, সিলেট আলিয়া ও বগুড়া মুস্তাফাবিয়া। এই তিন মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের ভেতন-ভাতা, পেনশন, অবকাঠামো উন্নয়নসহ যাবতীয় ব্যয়ভার রাষ্ট্র বহন করে থাকে।অন্যদিকে দেশে উপরে উল্লেখিত সমপরিমান সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে ৪০০৭ টি কলেজ এবং ৮ শতাধিক স্কুল।অপেক্ষায় আছে আর তিন শতাধিক।
বাংলাদেশেমদ মোট আলিয়া মাদরাসা রয়েছে ১৯ হাজার ৯৮৫টি, এর মধ্যে তিনটি সরকারি এবং বাকিগুলো বেসরকারি। ২০১৫ সালের বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, এসব মাদরাসায় দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পর্যায়ে মোট ২৪ লাখ ৯ হাজার ৩৭৩ জন শিক্ষার্থী পড়ালেখা করে।আর প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত আর ও ৩৮ লাখের কাছাকাছি। ডয়চে ভেলের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে ইবতেদায়ি মাদরাসার সংখ্যা ৬,৮৮২টি, দাখিল মাদরাসা ৯,২২১টি, আলিম মাদরাসা ২,৬৮৮টি, ফাজিল মাদরাসা ১,৩০০টি ও কামিল মাদরাসা ১৯৪টি। এই গুলি এমপিওভুক্ত এবং পরিচালিত হয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে।এগুলির বেতন-ভাতা রাষ্ট্র বহন করে। তবে বাড়িভাড়া ও চিকিৎসাভাতা হিসেবে যা দেয়া হয়, তা একেবারে নগণ্য এবং লোক দেখানো। এসব মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের পেনশন সুবিধা নেই; অবসর নেয়ার পর ৫-১০ বছর অপেক্ষা করে কিংবা অনেকে মৃত্যুর পর কল্যাণ তহবিল ও অবসর ভাতা হিসেবে এককালীন নগদ অর্থ পেয়ে থাকেন । কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া কোনো বেসরকারি আলিয়া মাদরাসায় গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। যত শিক্ষক প্রয়োজন, জনবল কাঠামোর কারণে তত শিক্ষককে এমপিও দেয়া হয় না। শিক্ষাকার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত যত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হয় তাদের বেতন-ভাতা মাদরাসা ফান্ড থেকে পরিশোধ করতে হয়। শ্রেণীকক্ষ, অফিস, লাইব্রেরি ভবন, ছাত্রাবাস, অডিটোরিয়াম ও শৌচাগার নির্মাণ, মাদরাসা সম্প্রসারণের জন্য জমি ক্রয়, ঘেরাও বেড়া মেরামত, দৈনন্দিন খরচ বিশেষ করে বিদ্যুৎ, পানি, অফিসিয়াল সামগ্রী, পাঠাগারের গ্রন্থ ক্রয়সহ সব খরচ প্রতিষ্ঠানের ফান্ড থেকেই নির্বাহ করতে হয়। ২০১৯-২০ সালের বাজেট থেকে কয়েকটি মাদরাসায় সরকারের ফ্যাসিলিটিজ বিভাগ থেকে দু’একটি ভবন তৈরি করে দেয়া শুরু হয় যার নির্মান এখনো শেষ হয়নি । কিছু মাদরাসা ছাত্রাবাসের স্বল্পসংখ্যক এতিম নিবাসীদের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ট পেয়ে থাকে। এগুলো অনেকটা নির্ভর করে ক্ষমতা,ঘুষ এবং তদবিরের ওপর। এ অবস্থায় এমপিওভুক্ত আলিয়া মাদরাসার পুরো বাজেটের ঠিক করতে হলে সরকারি অনুদানের পাশাপাশি ধর্মপ্রাণ দানশীলদের নির্ভরশীলতার বিকল্প নাই। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের সরকারি অংশ, ছাত্রবেতন, বার্ষিক সভা, রমজানের চাঁদা, কোরবানির পশুর চামড়ার দাম এবং বিত্তশালীদের অনুদান নিয়ে বার্ষিক বাজেট তৈরি করা হয়।
কওমি মাদরাসাগুলো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বা অনুদান গ্রহণ করে না। এসব মাদরাসা স্থানীয় দ্বীনদরদি পৃষ্ঠপোষকদের অনুদান ও সাহায্য সহযোগিতায় পরিচালিত হচ্ছে।
২০১৫ সালের ব্যানবেইস তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদরাসা রয়েছে। এসব মাদরাসায় ছাত্রসংখ্যা ১৪ লাখ। নূরানি মাদরাসার সংখ্যা এই হিসাবের বাইরে। ছয়টি শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে এসব মাদরাসা পরিচালিত হয়ে আসছে। ছয়টি বোর্ডকে সমন্বিত করে উচ্চতর একটি প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ রয়েছে, যা ‘হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়াহ’ নামে পরিচিত। এটি সরকার কর্তৃক স্বীকৃত। এটার প্রদত্ত দাওরায়ে হাদিসের সনদ মাস্টার্সের সমমর্যাদা সম্পন্ন।
দেশের ৪৯ তম বাজেট ঘোষনা হল ১১ই জুন তারিখে।নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষা খাতে ও বাজেট ঘোষনা হয়।শিক্ষাখাতে বিদায়ী অর্থবছরের চেয়ে আসন্ন অর্থবছরে পাঁচ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
এবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় (দুই বিভাগ) মিলিয়ে শিক্ষাখাতে মোট ৬৬ হাজার ৪০১ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে যা গত ২০১৯-২০ অর্থ বছরে এই দুই মন্ত্রণালয়ের বাজেট ধরা হয় ৬১ হাজার ১১৪ কোটি টাকা।
মোট বাজেটের মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় ২৪ হাজার ৯৪০ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছ। যা এবারের শিক্ষা বাজেটের ৩৭% ।যা গত অর্থবছরে ছিল ২৪ হাজার ৪০ কোটি টাকা।বেড়েছে ৯০০ কোটি টাকা অর্থাৎ মোট বাজেটের ১.৫% । অথচ মাদ্রাসা ইবতেদায়ীর জন্য আলাদা বাজেট উল্লেখ করা হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জন্য বাজেট ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকা অর্থাৎ মোট শিক্ষা বাজেটের ৫০.২%। যা গত অর্থ বছরে ছিল ২৯ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। বেড়েছে ৪ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা অর্থাৎ ৭% এর কাছাকাছি। আর কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের জন্য বাজেট ধরা হয়েছে আট হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা যা মোট শিক্ষা বাজেটের মাত্র ১২.৬%। যা গত অর্থ বছরে ছিল সাত হাজার ৪৫০ কোটি টাকা।বেড়েছে ৮৯৪ কোটি টাকা অর্থাৎ মাদ্রাসায় বেড়েছে ১.৪% এর কাছাকাছি ।এটি বৃদ্ধির কারন ও হচ্ছে নতুন এমপিও ভুক্ত মাদ্রাসার ব্যায়ভার বহনের জন্য।
যেখানে প্রাইমারি +মাধ্যমিক +উচ্চ মাধ্যমিকে বাজেট বেড়েছে ৯০০+৪৫০৭=৫৪০৭ কোটি টাকা অর্থাৎ ১.৫%+৭%=মোট ৮.৫% সেখানে মাদ্রাসায় বাড়ল মাত্র ৮৯৪ কোটি টাকা অর্থাৎ ১.৪%। বিষয়টি ভাবনার ও।
প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থমন্ত্রী বলেছেন অচিরেই সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি করে ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরসহ ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু মাদ্রাসার ইবতেদায়ীর কথা তিনি বেমালুম ভু্লে ই গিয়েছেন।মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠানে অপেক্ষাকৃত কম বাজেটের কারনে সুযোগ সুবিধায় পিছিয়ে পড়বে মাদ্রাসা গুলি।সুযোগের আশায় অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীরা ছুটবে স্কুল – কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে আলিয়া মাদ্রাসা গুলি।শিক্ষার্থী কমের অভিযোগে বন্ধ ও হয়ে যেতে পারে অনেক মাদ্রাসা।তাই স্কুল-কলেজের পাশাপাশি মাদ্রাসাতে ও সমহারে বাজেট ঘোষনাই মাদ্রাসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে।
ফিরোজ আলম,বিভাগীয় প্রধান(অনার্স শাখা),আয়েশা (রা:) মহিলা অনার্স কামিল মাদ্রাসা, সদর,লক্ষীপুর। প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক,কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি এবং সাধারন সম্পাদক,লক্ষীপুর জেলা শাখা।বিএমজিটিএ।
।মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয় ।

You must be logged in to post a comment.